ছোটবেলা থেকে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী পড়ে পড়ে ভ্রমণ করার শখটা যে প্রায়ই মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তা বিচিত্র নয়। তো সেদিন হাসিনা আপার বাসায় সবাই মিলে যখন পার্থ দা কে চেপে ধরল আমাদের কয়জনকে নিয়ে একটা Day Trip প্ল্যান করতে তখন আমিও বেশ সায় দিয়ে গেলাম। সময়টা ছিল গতবছর, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। এর দুই দিন পরেই হঠাৎ দেখি দাদার ইমেইল, যে ৩১ তারিখ, ২০১৬ এর শেষ দিন টা আমরা ব্যস্ত না থাকলে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দেখতে যেতে পারি। না না ঘাবড়াবার কিছু নেই, জীবন্ত মানে যে ওখানে গেলেই গরম লাভায় ঝলসে যাব, সেরকম নয় ব্যপারটা। এই মাঝে মাঝে একটু অগ্ন্যুৎপাত ঘটার সম্ভাবনা আছে, এটুকুই।
আমি এখন আছি লস বানোস , ফিলিপিন্সে; আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটে (IRRI) পিএইচডি র কিছু কাজ করছি। শীতের ছুটিতে সবাই মোটামোটি দেশে গিয়েছে। আমরা এই ক'জন হাঁপিয়েই উঠেছিলাম; তাই দেখা গেল, সবাই একবাক্যে রাজি যেতে। শর্মিষ্ঠা দি সেই অনুযায়ী ১৪ সিটের গাড়িও ভাড়া করে ফেললেন। আমরা মোট ১৫ জন, তার মধ্যে ৩ জনের বয়স আট এর নিচে, সেই হিসেবে ১৪ সিটে ভালই এঁটে যাবে সবাই। ঠিক হল, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে গাড়ি আসবে IRRI এর হারার হলে, তারপরে রেমুন্ডো গেটের থেকে বাকিদের নিয়ে নিবে।
কিছুটা উত্তেজনা কাজ করছিল, অনেক দিন পরে ঘুরতে যাওয়া হবে দেখে, তাও আবার আগ্নেয়গিরি। মাঝখানের ৩ দিন চোখের পলকেই কেটে গেল। ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ সকাল বেলা যাত্রা শুরু করলাম। সবাই উঠার পরে গাড়ি চলা শুরু করল "তাল" আগ্নেয়গিরির দিকে। হ্যাঁ, গিরির নাম তাল। এই সুযোগে গিরিটা সম্পর্কে একটু বলে নেই। বলা হয়ে থাকে, বাতাঙ্গাস প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত এই তাল গিরি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, যদিও এর ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস ভয়ঙ্কর। লাজন দ্বীপপুঞ্জের আগ্নেয়গিরির সারির মধ্যে এটি অন্যতম। প্রায় ৫০০ হাজার বছর আগে দুইটি টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় এই আগ্নেয়গিরির। তবে এর একটি বিশেষত্ব হল, এটি একটি আগ্নেয়গিরি দিয়ে পরিবেষ্টিত লেকের মধ্যে অবস্থিত যা আবার আরেকটি বড় লেকের মধ্যে অবস্থিত। মজার ব্যপার হল, আরও গভীরভাবে যদি চিন্তা করি এই সম্পুর্ণ লেক পরিবেষ্টিত গিরি এবং আগ্নেয়দ্বীপটি কিন্তু আবার ফিলিপিনস দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে অবস্থিত যা দুর্লভ। আসলে বিভিন্ন সময়ের অগ্ন্যুৎপাতে তাল লেক এর সৃষ্টি হয়েছে আবার পরে লেকের ভিতরে ছোট আগ্নেয়গিরি দ্বীপটির সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর ১৬টি decade volcano র মধ্যে এটি অন্যতম। যখন কোনো আগ্নেয়গিরি অনেকবার অগ্নুৎপাত ঘটায় এবং জনবসতির কাছাকছি হওয়াতে মানুষের ক্ষয়ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায় তাদেরকে এই decade volcano র অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এপর্যন্ত ৩৩ বারের বেশি অগ্নুৎপাতের ইতিহাস আছে এর। মূল গিরি থেকে শেষ ভয়ঙ্কর অগ্নুৎপাত ঘটে ১৯১১ সালের দিকে আর বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পরে শেষ অগ্নুতপাতের ইতিহাস ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে। তবে এখনো নাকি সিসমিক স্কেল এ মাঝে মাঝে বিপদসীমার উপরে চলে যায় এর কম্পনবিধি।
সেদিন আকাশে ছিল মেঘের ঘনঘটা। শেষমেষ বৃষ্টিটা শুরুই হয়ে গেল যেতে যেতে ,গাড়ির মধ্যে সবাই হাসাহাসি করতে লাগলাম যে আমরা একসাথে কোথাও বের হলেই নাকি এরকম বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। রাস্তা বেশ ভাল, তবে চড়াই উৎরাই আছে কিছু। প্রায় ২ ঘন্টা লেগে গেল তালিসে শহরে পৌঁছতে। এই শহরের কাছেই তাল হ্রদ। বৃষ্টি তখন মোটামোটি জোরেশোরেই হচ্ছে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে লেকের পাশে অপেক্ষা করলাম কিছুক্ষন বৃষ্টি কমার জন্য। লেকের পাশে বেশ সুন্দর বাঁশের তৈরি কয়েকটি কুটির আছে, এগুলো পাশের রেঁস্তোরার অংশ, ভিতরে টেবিলও আছে বসে খাওয়ার জন্যে। পরে শুনলাম এরকম বাঁশের কুটির নাকি রেডিমেড অবস্থায় কিনতেও পাওয়া যায়। বৃষ্টি একটু কমলে আমরা ৩ টা ইঞ্জিন চালিত নৌকা (এদের ভাষায় বলে বাঙ্কা) ভাড়া করে চললাম গিরির দিকে। এই নৌকাগুলো ফিলিপিন্সের বিশেষ নৌকা, আমার মনে হল এটার দুইপাশে দাঁড়ের মত সাপোর্ট থাকায় এর ভারসাম্য বেশ ভাল। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশাল অগ্ন্যুৎপাত এই হ্রদকে সমুদ্র থেকে আলাদা করে ফেলে। এখানে পানি প্রথমে লবনাক্ত থাকলেও এখন নাকি এটি মিঠা পানির হ্রদ হয়ে গেছে। যদিও উত্তাল বাতাসে আর বৃষ্টির বদৌলতে আমি ঠিকই টের পেলাম সেই পানির স্বাদ, আমার কাছে একটু লবনাক্তই লাগল। অদ্ভূত একটা অভিজ্ঞতা। চার পাশে বৃষ্টি, বাতাস আর উত্তাল লেকের ঢেউ এর মাঝে দিয়ে ছুটে চলা। পথে কিছুক্ষন চালকের সাথে গল্প করলাম। কথায় কথায় জানা গেল সে আগে ম্যানিলা (ফিলিপিন্স এর রাজধানী) তে ড্রাইভারের কাজ করত, কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে এই নৌকা চালিয়েই তার চলছে। সে আরও বয়ান করল তাল গিরির অগ্ন্যুতপাতের ইতিহাস। ১৯৬৭ সালে শেষ লাভা উদ্গীরন ঘটে এই গিরি থেকে, তার ফলে নাকি অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে আর এজন্যেই এখানে বেশির ভাগ বাড়িঘর এরকম কুটিরের মত করে বানানো। প্রায় ৩০ মিনিটের নৌকা ভ্রমন শেষে আমরা পৌঁছে গেলাম তীরে। ফিলিপিন্সে একটা জিনিস খুব ভাল লাগে, এরা সব কিছু বেশ সুন্দর করে সাজাতে পছন্দ করে। এখানে নেমেই দেখলাম I Love TAAL Volcano লেখা বিশাল বর্ণমালা সাজিয়ে রেখেছে। টুরিস্টরা মহা আনন্দে তার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। মনের স্মৃতির সাথে সাথে মুহূর্ত গুলোকে ক্যামেরাবন্দী করার প্রচেষ্টা। নৌকা থেকে নামার সময় কিছু ফটোগ্রাফার এর দল তুলে নেয় ছবি। ফিরে আসার সময়ে এই ছবিগুলো প্রিন্ট করে বিক্রি করার চেষ্টা করবে সবার কাছে, কেউ নিবে কেউ হয়ত নিবেনা। এই টুরিস্ট ফটোর স্ট্র্যাটেজি সারা বিশ্বেই বেশ চালু ।
আমরা এগোলাম পাহাড়ে উঠার রাস্তা ধরে। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট পাড়ার মত, গড়ে উঠেছে টুরিস্টদের খাতিরেই, যদিও এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা সরকার থেকে নিষিদ্ধ করে দেয়া। পাশেই ঘোড়ার আস্তাবল, চাইলে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়েও গিরির চূড়ায় উঠা যায়, অথবা পায়ে হেঁটে। ঘোড়াগুলোকে দেখে কেউই ঠিক ভরসা করতে পারলাম না তাই সবাই পায়ে হেঁটে উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম। পাহাড়ে উঠতে প্রথমে খুব একটা খারাপ লাগলনা, খুব খাড়া নয়। তবে একটু বালি বালি, আস্তে আস্তে চারপাশের প্রকৃতি তার রহস্য উন্মোচন করতে থাকল। আর সেই সাথে আছে ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি। ভাগ্যিস বৃষ্টি খুব জোরে হচ্ছিলনা, না হলে হয়ত আমরা আর উঠতেই পারতাম না। অর্ধেক রাস্তা মত উঠে একটা ছাউনি। সবাই সেখানে বসে হালকা লাঞ্চ করে নিলাম, আর সেই সাথে চলল ফটোশ্যুট। চারপাশে অনেক গুলো ছোট ছোট গিরি, কোথাও কোথাও ধোঁয়া উঠছে পাহাড়ের গা থেকে। দূরে মেঘের মাঝে মাঝে ভেসে উঠেছে পাহাড়ের সারি। ঘোড়ায় করে অনেক অভিযাত্রী দল উঠছে, হুট হুট শব্দ করে একটু পর পর তারা আমাদের পাশ কাটিয়ে উঠে যাচ্ছে। আবার শুরু হল পথচলা, এবার যেন একটু একটু কষ্ট হল উঠতে, মনে হয় প্রায় চূড়ার কাছে চলে এসেছি দেখে। পথে এখন লাল বালি আর মাটি। খনিজ মিশে আছে, বাতাসে একটু একটু সালফারের গন্ধ, আর কিছু গর্ত দিয়ে ধোঁয়া উঠছে। উঠে আবার একটু বিশ্রাম নেয়ার পালা। এদেশ যেন ডাবের ই দেশ, পাহাড়ের চুড়ায় ও তার ব্যাতিক্রম নয়, দামটা যদিও দ্বিগুণ। তাগালগ (ফিলিপিন্সের বেশ কয়েকটি ভাষার একটি ) ভাষায় একে বলে বুকো। বাচ্চারা খেলো বুকো জুস। আমরা এবার উঠলাম একদম উপরের অব্জারভেশন ডেক এ। উঠেই অবশ্য হতবাক হয়ে গেলাম। এতক্ষন আমরা চারপাশের পুরো দৃশ্য দেখতে পারিনি, এবার যেন প্রকৃতি সবটুকুই উজাড় করে দিল।
দূরে লাল মাটি আর বালি দেখা যাচ্ছে, লাভা জমে নাকি এরকম গঠন হয়েছে ওখানকার মাটির। আর সামনে লেকের মধ্যে ছোট্ট আগ্নেয় দ্বীপটা । এই ছোট্ট লেকটা সালফিউরিক এসিডের সাথে বোরন, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম এবং সোডিয়ামের লবন মিশে তৈরি। ঐ খানেও যাওয়া যায়, কিন্তু যেতে সময় লাগবে দেখে আর আমাদের নৌকার কাছে তিন ঘন্টার মধ্যে ফিরতে হবে দেখে আমরা আর যাইনি। এর মধ্যে সবাই আবার এক পশলা ভয়ও পেয়ে গেল, রত্নার মাসীমা, যিনি শাড়ির সাথে হিল স্যান্ডেল পড়ে দিব্যি পাহাড়ে উঠেছেন, ঘোষণা দিলেন, তিনি ভুমিকম্পন টের পাচ্ছেন। সাথে সাথে তুহিন ও সায় দিল, সেও টের পেয়েছে। কিছুক্ষন থেকে এবার নিচে নামার পালা। কি এক অজানা কারনে মনে হল নামতে পারলে স্বস্তি। পাহাড় থেকে নামাটা যত সহজ ভেবেছিলাম ততটা সহজ হলনা। কারন মাটি একটু বালি বালি। তারপরেও উঠার তুলনায় অনেক শীঘ্রই নেমে আসলাম। আমাদের নৌকা অপেক্ষা করছিল নিচে। একই নৌকায় ফিরলাম। এবার পুরোপুরি ভিজে গেলাম লেকের উত্তাল ঢেউ আর নৌকার গতিতে। এপারে এসে আবার একটু খিচুড়ি খাওয়া হল। লেকের পানি আর বৃষ্টিতে ভিজে সেই খিচুড়ি যেন অমৃতের স্বাদ দিল। সন্ধ্যা হাতে তখনও কিছু সময় বাকি ছিল দেখে আমরা ঠিক করলাম তাগাওতা শহরে যাব। প্রায় ২৫০০ ফুট উপরে মাউন্ট গঞ্জালস এর উপরে People's park in the sky নামে একটি পার্ক আছে যেখান থেকে পুরো এলাকাটা সুন্দর দেখা যায়। আগে এর নাম ছিল "palace in the sky" । এখানে একটি আবহাওয়া কেন্দ্রও আছে। আমরা ধীরে ধীরে মেঘের উপরে উঠে যাচ্ছিলাম দেখে আমাদের বাচ্চা বাহিনী, অর্ঘ্য , মারজানা আর সৃজন খুব মজা পেয়ে গেল। হাত দিয়ে ধরে মেঘ খেয়ে ফেলার বিফল চেষ্টা ওদের এনার্জি বাড়িয়ে দিচ্ছিল যেন আরও। উপরে উঠে মনে হল শীতের দেশে চলে এসেছি। মেঘের জন্য কয়েক হাত দুরের বস্তুও দেখা যায়না, নিচের শহর তো দূরের কথা। আমরা সবাই মিলে তাকিয়ে থাকি পাহাড়ের উপর থেকে। হঠাৎ করে মেঘ সরে গিয়ে চিকচিকে সোনালি রঙ এর শহর ভেসে উঠে নিচে, আবার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই হাওয়া হয়ে যায়। এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে প্রিয়লাল দা দরদাম করে কিছু স্থানীয় কলা কিনলেন । লস বানোসে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে গেল। ঘটনাবহুল ২০১৬ সালকে এভাবেই বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম আমরা ১৫ জনের ছোট্ট অভিযাত্রী দল। চারিদিকে তখন চলছে আতশবাজির খেলা, প্রস্তুতি চলছে নতুনকে বরন করে নেয়ার।


No comments:
Post a Comment