হোটেল এর সকালের নাস্তাটা কমপ্লিমেন্টারি হিসাবে দেয়। বুফে সিস্টেম, অনেক কিছু থাকে। আমার কক্ষ সঙ্গী ডালিয়া খুব খাদ্য রসিক, অনেক কিছু নিয়ে খায় দেখি। আবার সাথের কিছু পাকিস্তানি মেয়ে ছিল ওরা আবার দেখি কিছুই খায়না, খুব সীমিত। আমাদের এই কনফারেন্স টা সত্যিকার অর্থেই অনেক গুলা দেশে মানুষের সমাহার, এক মেয়ের সাথে পরিচয় হল, সে তুরস্কের কিন্তু পি এইচ ডি করছে চায়না তে। হঠাত আমাদের টেবিল এ আরেকটা মেয়ে এসে বসল, কথা বলে জানা গেল সে আমাদের এখানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর প্রতিনিধি হয়ে এসেছে। আজকে BIOVISION এর মূল কনফারেন্স শুরু, তাই আমাদের YOUNG SCIENTIST দের গ্রুপ ছাড়া বাকিরাও চলে আসছে। অনেক নতুন মুখ দেখলাম। নাস্তা শেষে সবাই চললাম বাস এর দিকে। বড় বড় হলুদ রঙ এর দুইটা বাস। এরা আমাদের প্রতিদিন নিয়ে যায় আলেক্সান্দ্রিয়া লাইব্রেরি তে আমাদের কনফারেন্স স্পট এ বাস এ পাশে বসল নাইজেরিয়ান ছেলে ইয়ু। কথায় কথায় ও আলাপ করছিল ওদের দেশের কথা,সেখানে পিএইচ ডি করে যেতে পারলে কাজ করার নাকি অনেক সুযোগ আছে।
যেতে যেতে চোখ পরে গেলো ডান দিকে। অসম্ভব সুন্দর ঘন নীল ভূমধ্যসাগর, গর্জন করে চলেছে। আমার মাঝে মাঝে খুব ঈর্ষা লাগে সমুদ্রের তীরের শহরবাসীদেরকে। কি সুন্দর মন খারাপ হলেই তারা চলে যেতে পারে সমুদ্রের বিশালতার কাছে। তীর ধরে হাঁটলেই তো মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা।
আমাদের বাস পৌঁছে গেছে alexandria লাইব্রেরি তে। ঠিক করলাম আজকে কফি ব্রেকের সময় আশেপাশের জায়গাটা একটু ঘুরে দেখবো। আজকে আমাদের BVA.NXT fellow দের জন্যে বিশেষ সেশন এর শেষ দিন। বিকেল বেলা মূল conferrence শুরু হবে। আজকের সেশনগুলো কম চমকপ্রদ ছিলোনা। কফি ব্রেকএর সময় বের হলাম একটু আশেপাশে ঘুরে দেখতে। বেশি দূর গেলামনা, সেশন শুরু হয়ে যাবে। বাতাসে সমুদ্রের নোনা গন্ধ, সেই সাথে মিশে আছে কতো বছর আগের ঐতিহ্য। লাইব্রেরি এর উলটো দিকেই alexandria ইউনিভার্সিটি। রাস্তা ঘাটে প্রাচীন alexandria কে ধরা রাখের অনেক প্রয়াস।
ফিরে এলাম আবার conferrence এ . আমাদের সবার পোস্টার গুলো টাঙ্গানো আছে হল রুম এ। সেই সাথে রয়েছে ই- পোষ্টারিং এর ব্যবস্থা। কম্পিউটার এ যে কেও চাইলে automated presentation দেখতে পারবে পোস্টারটার, সেটা অবশ্য আমাদের তৈরি করে আগে জমা দিতে হয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম অন্য পোস্টার গুলো। Biological সাইনস এ কতো রকমের কাজ। আমার সাথে এক মেয়ে বললো সেও salinity টলারেন্স নিয়ে কাজ করে, মাটির , অর্থাৎ মাটির লবনাক্ততা কীভাবে কমান যায়, তা নিয়ে, তার background অবশ্য chemistry।
আজকের লাঞ্চ এর পরে আমাদের ঘুরে দেখানো হল লাইব্রেরির ভিতর টা। আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম এই টুর টা নিয়ে। লাইব্রেরি এবং এর ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের guide অনেক কিছু বললো। ১৯৭৪ এর দিকে alexandria তে এই নতুন লাইব্রেরি টা তৈরীর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অনেকটা সেই প্রাচীন লাইব্রেরি এর আদলে। উদ্দেশ্য ছিল এটি হবে আধুনিক যুগে জ্ঞান চর্চার তীর্থস্থান। এই লাইব্রেরি তে আপাতত আরব, ইংলিশ ও ফ্রেঞ্চ ভাষার বই আছে। আর প্রায় আট মিলিয়ন বই রাখার মত সেলফ আছে। এখানে ৪ টি museum, ৪ টি আর্ট gallery আছে, planitarium এবং manuscript restoration ল্যাবরেটরি ও আছে। প্রধান রিডিং রুম টা অদ্ভুত সুন্দর আর বড়। ভালো লাগল অন্ধদের জন্যে ব্রেইল সিস্টেমের আলাদা সেকশন আছে দেখে। এদের কাছে ইন্টারনেট archive এর একমাত্র backup থাকে জেনে রোমাঞ্চিত হলাম । Antiquity এবং mansucript Museum গুলো ঘুরান শেষে আমাদের নিয়ে আসলো culturama section এ . এখানে অনেক বড় একটা panaromic স্ক্রীন আছে যেটা ৯ টি আলাদা ফ্ল্যাট স্ক্রীন এর সমন্বয়ে গঠিত। এখানে মিশরের ৩ টি সময়কে তুলে ধরা হয়েছে, প্রাচীন egypt থেকে শুরু করে, ইসলামিক civilization এবং শেষে মডার্ণ egypt। দেখলাম বিখ্যাত আলেক্সান্দ্রিয়া বাতিঘরের জায়গাটা। মনে হল আমিও চলে গেছি সেই প্রাচীন মিশর এ ।
রাতে হোটেল এ ফিরে কিছুক্ষণ ঘুরাফিরা করলাম আশেপাশে। রুমে এসে দেখি ডালিয়া বসে আছে ওর খাটে , বললো আজকে স্পেসিয়াল কিছু খেতে ইচ্ছা করছে। ওর কোন arabic ফ্রেন্ড নাকি কায়রোতে থাকে যে ওকে জাফির নামে একটা রেস্তরার কথা বলেছে, যেখানে খুব ভালো সী ফুড পাওয়া যায়। আমি চাইলে আমরা দুই জন মিলে সী ফুড খেতে জাফির এ যেতে পারি। আমার adventerous মন আনচান করে উঠল, এই সুযোগে শহরটা আরেকটু ভালো করা দেখা হবে। রেডী হয়ে নিলাম , রাতে alexandria তে ভালোই ঠান্ডা পড়ে। শালটা জড়িয়ে নিলাম গায়ে। রাস্তায় এসে খোঁজ করলাম ট্যাক্সির। বেশির ভাগি চেনেনা রেস্তরাটা। একজন যাওবা চিনল দাম হেকে বসলো অনেক। ডালিয়া ভালো আরবীতে কথা বলতে পারে। ও ই কথা চালালো ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে। অবশেষে উঠে বসলাম ট্যাক্সি তে । কিছুক্ষণ পর দেখি taxi driver ডালিয়াকে আমার সম্পর্কে জিগেস করছে। আমার দেশ বাংলাদেশ শুনে সে খুব খুশি, তার পরিচিত কোনো এক বন্ধু নাকি বাংলাদেশী এবং সে এরশাদের নাম ভালো মতো জানে। আর এটাও তার কাছে একটা অবাক হবার মতো বিষয় যে আমাদের দেশের প্রধান মন্ত্রী একজন মহিলা। রাতের আলেক্সান্দ্রিয়া দেখতে দেখতে চললাম। একে তো অচেনা জায়গা, তার উপরে রাতের বেলা, ভাষাও জানিনা এদের। চললাম আল্লাহর উপর ভরসা করে। কিছুদুর আসার পড়ে আমাদের দুইজনেরি মনে হলো আমরা ঠিক পথে যাচ্ছি তো, জাফির এতো দূরে হওয়ার কথা না। চারপাশে ডক এর বড় বড় container. আর নির্জন বস্তি মত এলাকা। ঘড়িতে বাজে রাত সাড়ে নয়টা। যাই হোক অবশেষে জানে পানি আসলো সমুদ্রের তীরে নিয়ন বাতিতে জ্বলজ্বল করতে থাকা জাফির লেখা দেখে। এখানে মেন্যু সিস্টেম টা মজার। বরফের মধ্যে বিভিন্ন রকমের মাছ সাজানো। যেটা পছন্দ সেটা দেখে বলে দিতে হবে। আমরা কিছু ফিস ফ্রাই আর সী ফুড স্যুপ অর্ডার করলাম ।
স্যুপটা অসম্ভব মজার ছিল, তার উপর সমুদ্রের তীরে বসে খাওয়া। এরকম অভিজ্ঞতা আড়েকবাড় হয়েছিল ফিলিপাইনে ম্যানিলা বে এর ধারে বসে। খাওয়া শেষে মনে হচ্ছিল বুঝি উঠতে পারবোনা। ওদিকে রাত অনেক হয়ে গেছে। ভাগ্য ভালো বের হয়েই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। এবার অনেক তাড়াতাড়ি চলে আসলো। বুঝলাম যাওয়ার সময় ভিড় এড়ানোর জন্যে ট্যাক্সিচালক ঘুরিয়ে নিয়ে গেছিল। আর তাছাড়া one way two way রাস্তার ঝামেলা তো আছেই। হোটেল এ পৌঁছলাম ১১ টার দিকে রুম এ ফিরে কাত , সারাদিনের ধকল ... কে জানে সামনের দিনে কি অপেক্ষা করে আছে ।








No comments:
Post a Comment