Wednesday, October 24, 2012

মিশরে অন্যরকম আটদিন - ২

২১শে এপ্রিল, ২০১২।। ইজিপ্ট এয়ার এর জন্য বসে থাকার পালা প্রায় শেষ। এর মধ্যে পরিচয় হল একজন বাংলাদেশী ভদ্রলোকের সাথে, তিনি কুয়েতে অনেক বছর ধরে ড্রাইভিং পেশায় আছেন। ফিরে যাচ্ছেন বাংলাদেশে, পরিবারের সাথে দেখা করতে। তার সাথে আরেক শিক্ষানবিশ কম বয়সী এক তরুণ, সে শ্রীলঙ্কান। গল্প হল কিছুক্ষণ এদের সাথে, এই কোথায় যাচ্ছি, কে কি করেন, কোন দেশে কিরকম লোকজন, চাকুরী কেমন এইসব নিয়ে। দুপুরে যখন এয়ারপোর্টের অতিরিক্ত ঠান্ডা এড়ানোর জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম গরমের খোঁজে, তখন তুরস্কের একটা পরিবার পাশে এসে বসল। দুই পিচ্চি আছে, একটা ছেলে, একটা মেয়ে, মহিলা বোরকা পরা। ব্যাগ থেকে রুটি বের করে মহিলা বাচ্চাগুলোকে দিল, সুইট পিচ্চি গুলোর সাথে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই চোখে মুখে খেলাধুলা করছিলাম, এইবার ঝামেলায় পড়লাম, পিচ্চি আমাকে রুটি সাধে, না করলেই গগনবিদারী কান্না শুরু করার উপক্রম করে। শেষমেষ ওদের মায়ের অনুরোধে নিতেই হল রুটি। কি আশ্চর্য এই যাত্রা, চেনা নাই, জানা নাই, সবাই একই পথের যাত্রী, বৈচিত্র্যময় এই পৃথিবীতে সবার একটাই পরিচয়, মানুষ।

অবশেষে ট্রান্সিট এর পালা শেষ হল, ইজিপ্ট এয়ার কেমন জানি মন খারাপ করা, অন্ধকার অন্ধকার, লোকজন খুব বেশি নাই। আমার সামনের সীটে বাচ্চাসহ একটা ফ্যামিলি এসে বসল। প্লেন ওড়া শুরু করতেই শুরু হল ওদের তারস্বরে কান্না। এখন চারদিকে সবাই আরবীতে কথা বলছে। অন্যরকম লাগছে সবকিছু। অথবা, আমি অনেক ক্লান্ত ছিলাম দেখে সবকিছু কেমন জানি অদ্ভূত লাগছিল। প্লেনের একমাত্র মজার জিনিস ছিল দারুন মজাদার চীজ কেক। 

আড়াই ঘন্টার মধ্যে প্লেনটা আলেকজান্দ্রিয়ার বরগ এল আরব বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল। এয়ারপোর্ট বেশি বড় না। তবে  এরপরে আমি কিছু অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার সঞ্চার করলাম। পাসপোর্ট, টিকেট চেকিং এর সময়ে কেন জানি তারা ভিসা টা কে বিশ্বাস করছিলনা, আর এরা এমন আজব উচ্চারণে ইংরেজী বলে। আমার অনেকক্ষণ লাগল বুঝতে যে  শ্রী কথাটার  মানে হল থ্রি।  এরপর আমাকে আলাদা করে এক রুমে এনে বসায়ে রাখল, এখানে নাকি একজন আছে যে ভাল ইংরেজী বলতে পারে! তার কাছে কিছুক্ষণ সবকিছু বয়ান করলাম, কি কারণে আসা, কোথায় যাব, ইত্যাদি। তার পরেও বসায়ে রাখল অনেকক্ষণ। যতই বলি বাইরে আমাকে হোটেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য ড্রাইভার থাকার কথা, তাকে ফোন কর, কানেই দেয়না। অবশেয়ে কনফারেন্স কর্তৃপক্ষকে ফোন টোন করল, কি বুঝল ওরাই জানে, প্রায় এক ঘন্টা পরে ছাড়া পেলাম এয়ারপোর্ট থেকে। অনেক সরি টরি বলল যদিও, আমি ঘুমে কিছুই মাথায় ঢোকাতে পারছিলামনা। পরে কনফারেন্স চলাকালীন সময়ে জানতে পেরেছিলাম, বরগ এল আরব দিয়ে শুধুমাত্র আমি এসেছি, বাকি সবাই কায়রো হয়ে এসেছে, এবং কারোরই এরকম কোন সমস্যা হয়নি। এর জন্য কর্তৃপক্ষ অনেক দু:খিতও ছিল।

সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে আমার স্যুটকেস নিলাম।এরা আবার একজন লোক দিল সঙ্গে এসকর্ট করে নেয়ার জন্য। আচরণে বোঝা গেল তারা যথেষ্ট ক্ষমাপ্রার্থী। বাইরে বের হতেই একঝলক হালকা ঠান্ডা বাতাস মন ভাল করে দিল। সেখানে চকচকে কাল গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল ড্রাইভার। 
রাত বাজে সাড়ে বারটা। ড্রাইভার বেশ হাসিখুশী, গাড়িতে উঠে বসার পর হালকা অ্যারাবিয়ান মিউজিক ছেড়ে  দিল। প্রায় আধাঘন্টা লাগল হোটেল পৌঁছতে। এর মধ্যে রাতের আলেকজান্দ্রিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। রাতের বেলা দূরে থেকে আল ঝলমলে একটা শহর দেখতে অনেক সুন্দর লাগে। আলেকজান্দ্রিয়া ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত। অ্যারাবিয়ান মিউজিক, রাতের সৌন্দর্য আর সারাদিনের ক্লান্তি মিলিয়ে অপার্থিব একটা অনুভূতি হচ্ছিল। হোটেলে এসে পৌঁছলাম, নামার পরেই ড্রাইভার টিপস চাইল। বুঝলামনা ঠিক কত দেয়া উচিত। আসার আগে ইন্টারনেটে এদেশের লোকদের ট্যুরিস্টদের কাছ থেকে টিপস নেয়া বৃত্তান্ত পড়েছি। পরে বুঝেছিলাম প্রথম দিন তাকে একটু বেশিই দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐ রাতের বেলা বিদেশ বিভূঁয়ে এয়ারপোর্টে তাকে দেখে যে ভরসা এসেছিল, তা অমূল্য।

হোটেলের নাম 'মেডিটেরিয়ান আজুর হোটেল' । রিসেপশনে গিয়ে আমার নাম ঠিকানা এবং আসার উদ্দেশ্য বললাম, ফরমালিটিস শেষে লোকটা আমার জন্য ঠিক করে রাখা রুমের চাবি দিল আর বলল তোমার ফ্রেন্ড বোধহয় আজকে সকালেই চলে এসেছে। ডাবল রুমটা আমার মতই আরেকজন পার্টিসিপেন্টের সাথে আমার শেয়ার করতে হবে। মাথায় আবার চিন্তা ঢুকল কেমন হবে সে। হোটেলের বেয়ারা আমার ছোট্ট  স্যুটকেসটা নিয়ে গেল আমাকে রুম চিনিয়ে দিতে। হোটেলের রিসেপশন থেকে সিড়ি দিয়ে একটু নিচে নেমে তারপরে দোতলা বিল্ডিং গুলোতে রুম গুলো। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ভুমধ্যসাগরের ঢেউ আছড়ে পরার শব্দ শুনলাম। রুমে এসে দরজা খুললাম সোয়া একটার মত বাজে। রুমটা বেশ বড়, পাশাপাশি দুইটা বেড। দেখি এক বিছানা থেকে লম্বা কৃষ্ণাঙ্গ এক মেয়ে উঠে বসল, আমাকে হাই হ্যালো জাতীয় একটা কিছু বলে আবার ঘুমিয়ে গেল। আমি ওয়াশ রুমে গিয়ে গোসল টোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে ঘুম দিলাম। 

No comments:

Post a Comment