Friday, October 19, 2012

মিশরে অন্যরকম আটদিন -১

২০ এপ্রিল, ২০১২।। আমি এখন বসে আছি কুয়েত এয়ারপোর্ট এ । সময় ৯ টা বেজে ৩০ মিনিট। প্লেন ল্যান্ড করেছে ৯ টার দিকে। এখানের আমাকে ১০ ঘন্টা থাকতে হবে! ট্রান্সিট এর কাউন্টারে গেলাম খোঁজ নিতে। counter  এ বসে আছে চৈনিক চেহারার এক মেয়ে, তবে খাস চীন দেশের নাও হতে পারে। মেয়েটা আমার দিকে বেশ করুণ করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল দু:খিত, তোমার আসলে যাত্রার আগেই বিশ্রামের জন্য রুমের কথা বলা দরকার ছিল, এখন আমাদের কিছু করার নাই। অতঃপর কি আর করা। আমার অভিজ্ঞতা কম, এসব ব্যপার খেয়াল ছিলনা। 

কুয়েত এর নাম ছোটবেলায় অনেক শুনতাম। আমার মেজচাচা অনেক আগে থাকতেন কুয়েতে, ফলে আব্বুআম্মুর কাছে সেখানকার বিভিন্ন গল্প শোনা হত। প্লেনটা যখন নামছিল, খেয়াল করলাম খালি খেঁজুর গাছ আর ক্যাকটাস প্রজাতির গাছ। বেশিরভাগ দেশই প্লেন ল্যান্ড করার সময় সবুজ দেখায় , কিন্তু এখানে সব হলুদ। মজার ব্যপার হল এখানে সিঁড়ি দিয়ে প্লেন থেকে নামতে হল। আমার জন্য মোটামোটি নতুন ব্যপারটা। যদিও ছোটবেলায় টিভিতে দেখতাম, প্লেন এসে থামার পরে সবাই প্লেন থেকে সিড়ি দিয়ে নামছে, বর্তমানে বেশিরভাগ এয়ারপোর্টেই তো সুড়ঙ্গের ব্যবস্থা থাকে দেখি। সে যাই হোক, এবার আমার এই ট্রিপ সম্পর্কে কিছু বলা যাক।

আমার গন্তব্যস্থল এবার মিশর। শুনলেই কেন জানি রহস্যের গন্ধে মনটা আনচান করে উঠে। মিশর আর এর মমির রহস্য কত শত গল্পই না পড়েছি এই জীবনে। এই পিরামিডে ঢুকতে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলা, মমি উধাও হয়ে যাওয়া, ফারাও দের সাম্রাজ্যের কাহিনী ইত্যাদি, ইত্যাদি। আরো excited কারণ আমি প্রথম যাচ্ছি আলেকজান্দ্রিয়াতে। সেই প্রাচীন লাইব্রেরী, যেখানে প্রাচীন পৃথিবীর সকল জ্ঞান তাপস তাপসীরা জ্ঞানচর্চা করে গেছেন। আর্কিমিডিস, অ্যারিস্টটল, থিওফ্রাস্টাস, টলেমী, ক্লিওপেট্রা আরো কত কে। আমার এবার গন্তব্য ক্লিওপেট্রার ভুমি।

মিশরে কেন যাচ্ছি? Biovision Alexandria নামে একটা conference  হয়ে থাকে, আলেকজান্দ্রিয়াতে দুই বছর পর পর। গতবছর এক অলস বিকেলে ল্যাবের ডেস্ক এ বসে বসে  জীব বিজ্ঞান সংক্রান্ত কনফারেন্স এর খোঁজ করতে করতে পেয়ে গেলাম এটার হদিস। TWAS  এর সহযোগিতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে তরুণ বিজ্ঞানীদের নির্বাচন করে এই কনফারেন্স এ যোগ দেয়ার সুযোগ করে দেয় Biovision, সেই সাথে থাকে নিজের গবেষণা উপস্থাপন,  অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের সাথে মতবিনিময় ও নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ। এই গেল মিশর যাত্রার শানে নযুল, যদিও আমার কেন জানি এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা ঠিক যে মিশরে যাচ্ছি।

যাত্রার প্রস্তুতিস্বরূপ তেমন কিছু করতে হয়নি। কনফারেন্স এর কর্তৃপক্ষ খুবই গোছানো। বিভিন্ন schedule and updates দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে। টিকেট কনফার্ম করল,  আমন্ত্রনপত্র  পাঠালো, তারপর গেলাম মিশর এম্ব্যাসি তে। সে ও এক কাহিনী। সেরকম ভীড় নাই মানুষের, মনে হয় বাংলাদেশ থেকে কি খুব কম লোক যায় ঐখানে? আমাকে প্রথমে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হল, বিরক্ত হয়ে যতবারই উঠে দাঁড়াই বিজাতীয় উচ্চারণে বলে উঠে "বোসেন, বোসেন"। পরে শুনি, এরা ঐদিনই আমাকে ভিসা ইস্যু করে দিবে বলে দেরী করছে।. তখন মনে একটু শান্তি আসল। সেই ভিসাও নরমাল একটা সীল এর মত, দেখে মনেই হয়না ভিসা। যাই হোক এখন আমার কাছে ভিসা আছে, টিকেট আছে, হোটেল বুকিং আছে, সব কাজ একা একা ঠিক করা , বুঝতে পারছিলামনা আদৌ ঠিক আছে কিনা সব কিছু। Me the last moment girl  অবশেষে যাওয়ার দিন সকালবেলা টাকা exchange করলাম। এক মিশরীয় পাউন্ড সমান ১৩ টাকা। এব্যাপারে সামসাদ জোর করে সাহায্য না করলে সময় কুলানো কষ্ট হত, security  র জন্য কিছু টাকা সাথে করে নিয়ে যাওয়া। পোস্টার টাও তড়িঘড়ি করে তৈরি করে প্রিন্ট করলাম। যাক হয়ে গেল সবকিছু। শুক্রবার ২০ এপ্রিল ভোর ৫:৩০ এ ফ্লাইট কুয়েত এয়ার এ। রিপোরটিং  ৩:৩০ এর মধ্যে। এই সময়ে এয়ারপোর্ট এ কেমনে যাব! তাই মামার সাথে বৃহস্পতিবার ১২ টায় গিয়ে বসে থাকতে হল। এয়ারপোর্টে রাত দিন কিছু নাই। মধ্যপ্রাচ্যের সব প্লেন যেখান থেকে ছাড়ে সেই লাউঞ্জে এ অপেক্ষা করতে থাকলাম। কুয়েত এয়ার এর কাউন্টার এখনো খোলেনি। আমার সামনের চেয়ারে দুইজন শয়তান শয়তান চেহারার লোক বসা, কিছুক্ষণ পর পরই ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে। বেশ কয়েকবার তাকানোর পরে রাগের চোটে জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলবেন? থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করে কোন দেশে যাবেন আপনি।  আমি আর কিছু না বলে অন্য সীটে গিয়ে বসলাম। 

রাত দেড়টার দিকে কাউন্টার খুলল। গেলাম তিন নম্বর কাউন্টারে। আরো ১৫ মিনিট পরে কাউন্টারে লোক আসল। বোর্ডিং পাস, ব্যাগেজ ট্যাগ হাতে নিয়ে ইমিগ্রেশনের দিকে যাওয়ার সময়ে খেয়াল করলাম আমার ব্যাগেজ ট্যাগ এ লেখা KU থেকে Cairo. কি সর্বনাশ! সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিলাম আবার কাউন্টারে। গিয়ে বললাম, ভাই আমি যাব আলেকজান্দ্রিয়াতে বরগ এল আরব এয়ারপোর্টে আর আপনি আমার ব্যাগ পাঠিয়ে দিচ্ছেন কায়রোতে? সেই লোক বলে, আপনি মিশরে যাবেননা? আমি বলি, হু, আলেকজান্দ্রিয়া আর কায়রো দুইটাই মিশরে কিন্তু দুইটা ভিন্ন শহর, ভিন্ন এয়ারপোর্ট, টিকেটটা দয়া করে ভাল করে পড়ে দেখেন। ভুল বুঝতে পেরে উনি সেপারেট আরেকটা ট্যাগ বানালো, কিন্তু ততক্ষণে আমার ছো্ট্ট ব্যাগটাতো চলে গেছে কার্গোতে। শুনলাম ট্যাগ বদল করে আরেকজনকে ট্যাগ টা replace  করে দিতে বলল। আমার মনে আশংকা একটু থেকেই গেল, আদৌ পাব কিনা আবার তার দেখা। একে তো ট্রান্সিট প্লেন, তার উপর আবার এই সমস্যা।

এরপর এলাম ইমিগ্রেশনে পুলিশ চেকিং এ। এই ব্যক্তি মনে হয় রাতের বেলা কাউন্টারে বসে bored feel  করছিল, অযথা প্রশ্ন করা শুরু করল, কি job  করি, কেন যাচ্ছি, family  ওখানে থাকে কিনা (?) , বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কি না, সরকারী চাকরী করি কিনা, এর আগে কোন কোন দেশে গেছি, ইত্যাদি, ইত্যাদি। সে সন্তুষ্ট হল কিনা জানিনা, তবে অবশেষে এর হাত থেকে রক্ষা পেলাম; আবার অপেক্ষার পালা। আমি এর আগে যত জায়গায় ট্রাভেল করেছি (যদিও খুব বেশি না), সবগুলো থেকে এটা কেমন জানি ভিন্ন। লাইনে দাঁড়িয়ে  আছি, হঠাত শুনি নিউইয়র্ক, লন্ডন, ফ্রান্কফুর্ট, আর সৌদী আরবগামী যাত্রীদের আলাদা করে ডাকা হল। আমাকে কোন category তে ফেলবে বুঝতে না পেরে বলল, যারা ফ্যামিলি সহ তারা আগায়ে আসেন। এই category  তেও আমি পরিনা দেখে অবশেষে আমাকে বলল, ম্যাডাম আপনি সামনে চলে আসেন। মাঝে মাঝে বিশেষ খাতির পেতে খারাপ লাগেনা। আবার বাধা আসল, সঙ্গের চোঙ্গা মত পোস্টার হোল্ডার দেখে। এটাকে আমার সাথে নিতে দিবেনা, ব্যাগেজ ট্যাগ এর মত উল্টোপাল্টা কিছু হওয়ার ভয়ে রাজী হলামনা। শেষমেষ এক কুয়েতী security officer এর কাছে গিয়ে তার অনুমতি নিতে হল।সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়ে থাকে এটার দিকে। খুলে দেখাতে হল এর মধ্যে বন্দুক নাই,  অবশেষে প্লেনে উঠে বসলাম, আমার পাশের সীটে  যে ভদ্রলোক এসে বসলেন, জানা গেল তিনি সৌদী আরব যাবেন, অনেক বছর যাবত ঐখানেই চাকুরী করছেন। আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষজনই এরকম যারা মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন।

অনেকক্ষণ লিখলাম, এর মধ্যে কুয়েত এয়ারপোর্ট ঘুরে শেষ করছি, খুব ছোট, ইন্টারনেট এর অবস্থা খুব ভাল না। public computer টা মনে হয় ঠিক নাই, আর free wifi   টার রেন্জ ভালনা। মাত্র ১০ টা ২০ বাজে, আরো ৯ টা ঘন্টা কিভাবে যাবে, কে জানে।

1 comment: